তিনজন : আমাদের দেশে যে গল্প বলা বারণ
“শিল্প একজন মানুষের কাছ থেকে যেভাবে নিষ্ঠা দাবি করে, মানুষের নেতিবাচক চিন্তা আর যন্ত্রণাগুলো থেকে মুক্তি পাবার উপায় দেয়,সত্য এবং নগ্ন বাস্তবতার আরেকটু কাছে মানুষকে আসতে দেয়-এসব হয়তো শিল্পকর্ম বা সেই কর্মের ফলাফলের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।” -আলবেয়ার কামু
তানজীম রহমানের মনোমুগ্ধকর লেখনী কিংবা সমাজের ভয়ংকর বাস্তবতা- দুটোই সমান আকড়ে ধরে রাখবে আপনাকে।
যৌনতা রাফায়েতের যে অঙ্গকে সবথেকে বেশি বিচলিত করে তা হলো চোখ। কেন যেন চোখদুটো যুক্তি শুনতে চায় না। আদবলেহাজ সব জানে ঠিকই; তবে আগে বেয়াদবী করে, পরে লজ্জা পায়।
রাফায়েত কাজ করে সানডিউ ব্যাংকে। বছরখানেক হলো জয়েন করেছে। ওর ডিপার্টমেন্টে আগে দুইজন মেয়ে কাজ করতো। একজন হিজাবী। আরেকজনের চারটা বাচ্চা। তাদের নিয়ে রাফায়েতের কখনও সমস্যা হয়নি। তবে দুই মাস আগে নতুন একজন মেয়ে যোগ দিয়েছে। রুদ্রা। তাকে নিয়ে সমস্যা হচ্ছে।
রুদ্রা এমনিতে চুপচাপ মানুষ। অপরূপা সুন্দরী নয়। চেহারায় একটা ঠান্ডা মারমুখী ব্যাপার আছে। চোখে কোনো মায়াদয়া নেই। চুল টাইট করে পেছনে বেঁধে রাখে। মোটা পনিটেইল থেকে কয়েকটা চুল শার্টের অবাধ্য সুতোর মতো আঁকাবাঁকা হয়ে বেরিয়ে থাকে।
তারপরেও রাফায়েতের বারবার চোখ যায় রুদ্রার দিকে। ইচ্ছাকৃত নয় ব্যাপারটা। বরং উলটো। রাফায়েত নিজেকে অনেকবার বলেছে যে আশেপাশে মেয়ে থাকলে যেন চোখ মেঝে থেকে না সরে। মগজের প্রতি অংশ এই আদেশ মেনে নিয়েছে। মানে না শুধু চোখ।
সেটা কেন? রুদ্রা সবসময় কালো পোশাক পরে আসে। কালো কামিজ, কালো সালওয়ার। কালো স্যুট, কালো প্যান্ট। বৃহস্পতিবারে কালো টি-শার্ট, নীল জিন্স। শরীরের অনেকখানি দেখা যায় এমন নয় । সবসময় আঁটোসাঁটো ফিটিং জামা পরে না। তাও, যেটুকু খেয়াল করা সম্ভব সেটুকুর দিকে তাকিয়ে থাকার মধ্যে একটা আনন্দ আছে। চাপা আগুনের মতো হয় পেটের ভেতর। কামিজ পরা রুদ্রা চেয়ারে কাত হলে কোমরের পাশে ভাঁজ পড়ে। সেই ভাঁজের দিকে কিছুক্ষণ পরপর রাফায়েতের চোখ যায়। একটা বড়ো ভাঁজ পড়ে কোমরের ঠিক ওপরে, তার ইঞ্চি খানেক ওপরে ছোটো ছোটো আরও দুটো।
কেন চোখ যায়? কালো রঙটা কি বেশি আবেদনময়? রাফায়েতের জন্য হয়তো উত্তেজক রঙের তালিকায় কালো তিন নম্বর হবে। বা চার নম্বর। প্রথমে থাকবে বেগুনী। তারপর কমলা। কমলা রঙটা যেন মেয়েদের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। তিন হবে লাল অথবা টিয়া রং। তারপর কালো। কালো হচ্ছে ইউনিসেক্স রঙ। বেশি আনুষ্ঠানিক। কালো পোশাক ছোটো হলে সেক্সি, গা ঢেকে রাখলে প্রফেশনাল।
তাও কেন চোখ সরানো যায় না রুদ্রার ওপর থেকে? এমন নয় যে শুধু রুদ্রার বেলায় এই সমস্যা। ওর প্রেমে পড়েনি রাফায়েত। অতীতের পথে যতোদূর অবধি স্মৃতি যায়, ততোদূর পর্যন্ত রাফায়েত খেয়াল করেছে দৃষ্টিসীমায় কোনো যুবতী মেয়ে থাকলে ওর সেদিকে চোখ যাবেই। তা রাস্তায় হোক, অফিসে হোক বা বাসায়। চোখ বাঁকা করে হোক বা সোজা। আধ সেকেন্ডের জন্য মেয়েটার দিকে তাকাতে হবেই। সেই আধ সেকেন্ডে মেয়েটার ব্যাপারে মোটামুটি একটা ধারণা পেয়ে যায়। মেয়েটা কি ট্র্যাডিশনাল না ওয়েস্টার্ন, মোটা না চিকণ, স্তন বড়ো না নিতম্ব।
রাফায়েত অনেক ভেবেছে এই বিষয়ে। এমনিতে ও বেশ লাজুক স্বভাবের ছেলে। অন্যরা কী ভাবছে তা নিয়ে ভাবতেই ভাবতেই দিন কাটিয়ে দেয়। ওর লজ্জাবোধ প্রচণ্ড জোরালো। বসের সাথে কথা বলতে গিয়ে যদি ভুলেও এমন কিছু বলে যেটা শুনতে বেয়াদবীর মতো লাগতে পারে, সেটা নিয়ে পরে মাসখানেক চিন্তা করে। তাই রাফায়েতের কথাবার্তার ধরন খুবই নিরপেক্ষ আর একঘেয়ে। অন্যরা ভুল বুঝতে পারে এমন যেকোনো কথা এড়িয়ে চলে। নিজস্ব মতামত দেওয়ার আগে দুইশ’ বার চিন্তা করে।
মেয়েদের দিকে চোখ যাওয়ার ব্যাপারে রাফায়েতের একটা ওয়ার্কিং থিওরি আছে। ওর ধারণা এই অভ্যাসটা টিভি থেকে শুরু হয়েছিলো। তারপর কম্পিউটারে এসেছে। যৌন আবেদন কী জিনিস, তা প্রথম টের পেয়েছে হিন্দি সিনেমার আইটেম গান দেখে। সে আমলে সব বাড়িতে নিজস্ব কম্পিউটার ছিল না। ইশ্ক কামিনা গানে ঐশ্বর্য রাইকে দেখার পর বারো বছর বয়সী রাফায়েতের জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। সেই মাখনের মতো সেই পেট, কোমরের পেছনে উল্কির মতো কারুকাজ, বৃষ্টিভেজা নাভির পাশে লেগে থাকা প্রতিটা পানির বিন্দু বোধহয় মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল ওর। ওদের ড্রয়িংরুমে টিভি ছিলো। সোফায় উপুর হয়ে টিভি দেখতো রাফায়েত। প্রায়ই উঠে দেখতো সোফার একটা অংশ ভিজে গিয়েছে। দ্রুত টিস্যু দিয়ে পরিষ্কার করতো। তখন বুঝতো না, কিন্তু এখন মনে হয় মা বোধহয় সোফার দাগগুলো ঠিকই দেখতে পেতো। মনে পড়লে রাফায়েতের ভেতরটা কুঁকড়ে যায়। লজ্জার মতো, কিন্তু ঠিক লজ্জা নয়, আরও বহুগুণে তীব্র কোনো আবেগ অনুভূত হয়। যে আবেগ ওর পেট এবং হাতের মাংসপেশীগুলোকে চেপে ছিবড়ে করে ফেলতে পারে।
বয়স চোদ্দ হওয়ার পর এক খালাতো বড়ো ভাইয়ের বাতিল কম্পিউটার রাফায়েতের ঘরে নিয়ে আসা হয়। তখন ইন্টারনেটের স্পিড ভয়াবহ। পাঁচশ এমবি নামতে সারারাত লেগে যায়। সেই অবস্থায় রাফায়েত দিনের পর দিন কম্পিউটার অন রেখে আইটেম গান আর পর্ন ভিডিও ডাউনলোড করতো। দেখতে দেখতে ওর সবগুলো গান মুখস্ত হয়ে গিয়েছিলো। ঠিক কোন সময়ে নায়িকার শরীরের কোন অংশে ক্যামেরা ফোকাস করে, সেটা জানা ছিল। টেনে টেনে সেই জায়গাগুলো বেশি দেখতো। হস্তমৈথুনের ঠিক অন্তিম মুহূর্তে বাঁ হাতে ভিডিও ফরওয়ার্ড করে সেই দৃশ্যগুলো স্ক্রিনে আনতো। কাজরা রে গানের শুরুতে, যেখানে ঐশ্বর্য রাই ব্যাকলেস ব্লাউজ দেখিয়ে কোমর দোলায়। শিলা কি জাওয়ানির শেষের দিকে, যখন ক্যাটরিনা সরু আঁচল পরে সামনের দিকে ঝুঁকে আসে। জিয়া জালে গানে প্রিতি জিন্তা যখন পানির নিচ থেকে ভেসে ওঠে…
এসব কারণে রাফায়েতের থিওরিটা হচ্ছে: সেক্সের বিষয়ে লিঙ্গের থেকে ওর চোখ বেশি প্রশিক্ষণ পেয়েছে। ভিডিওর যেখানে যেখানে চোখ রাখার কথা; মতান্তরে নারীদেহের যে অঙ্গগুলোতে চোখ রাখার কথা; সেখানে এখন ওর দৃষ্টি নিজে থেকেই চলে যায়। চিন্তা বা বিবেকের অপেক্ষা করে না। পেশীর স্মৃতি মগজের স্মৃতির চেয়ে অনেক প্রখর। বহুদিনের চর্চার কারণে অভ্যাসটা ভিডিও থেকে বাস্তবেও চলে এসেছে। সামনাসামনি নারী দেখলেও চোখ নিষেধ মানে না।
আজ রাফায়েত অফিসে বসে এই কথাগুলো ভাবছে। ইচ্ছা করে নয়। ওর অ্যাংজাইটি আছে, তাই। অ্যাংজাইটির সময় চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। হাজার হাজার দুশ্চিন্তা একসাথে ভিড় করে। শুধু মাথায় নয়, বুকে। পাঁজরের ভেতর, বুকের বাঁ দিকে শক্ত হয়ে যায়। যেন একদলা রক্ত শুকিয়ে হৃৎপিণ্ডের ভেতর জমাট বাঁধে। এর মধ্যেই মগজ ছুটে যায় সেক্সের চিন্তায়। কয়েক মিনিট পরপর। হয়তো দুশ্চিন্তা থেকে রেহাই খোঁজে। যেহেতু অফিসে বসে আছে, তাই লাজুক রাফায়েতের সেক্সের চিন্তায় আরও অস্বস্তি লাগে।
এখন ও দুশ্চিন্তা করছে কারণ বসের কাছে একটা মেইল পাঠিয়েছে। একটা নতুন ব্যানার হচ্ছে ব্যাংকের জন্য। ঢাকার বিভিন্ন পার্কে বসবে। ব্যানারে লেখা থাকার কথা: ‘আপনার শরীরের স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য আছে পার্ক, আর মানিব্যাগের স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য আছে সানডিউ ব্যাংক’। সেই ব্যানারে সানডিউ বানান ভুল আছে। সানভিউ লিখেছে ডিজাইনার। এটা রাফায়েত খেয়াল না করেই মেইল দিয়ে দিয়েছে। এখন বস দেখলে কী বলবে?
আরও চিন্তার বিষয় হচ্ছে যে রাফায়েতের বস অফিসে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তার ব্যক্তিত্ব রাফায়েতের সম্পূর্ণ বিপরীত। মজলিশী মানুষ, বিশালদেহী। কোনো উপলক্ষ্য পেলেই সবাই তার চেম্বারে ভিড় করে। শুধু রাফায়েতের ডিপার্টমেন্টের মানুষজন নয়। অন্যরাও ব্যাপারটা শিখে গেছে। বস তাদের জন্য কাভাৎজো থেকে কেক আনায়, ফখরুদ্দিন থেকে বিরিয়ানী অর্ডার করে, বা আহেলী থেকে কাবাব খাওয়ায়। এমন বসের বিরুদ্ধে গীবত করে আরাম নেই। কোনো সহকর্মীর সাথে বদনাম করতে বসলে সে মুখে সম্মতি জানায়। মনে মনে ধরে নেয় ভুলটা রাফায়েতেরই ছিলো। এই পরিস্থিতিতে সবথেকে নিরাপদ হচ্ছে দোষটা অন্য কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়া। কিন্তু কার ওপর দেওয়া যায়? ডিজাইনার যা-ই লিখুক, সেটা ছাপানোর আগে রাফায়েতের চেক করে ছাড়ার কথা। এমন সময় রুদ্রা ওর ডেস্কের পাশে এসে বললো: “আজকে কি বাসা থেকে লাঞ্চ এনেছেন?”
তানজীম রহমান
Leave a Reply