বৃষ্টির দিন ভাড়া বেশি : প্রথম অধ্যায়
এ গল্পে বৃষ্টি আছে এবং ভূত আছে। একজন রিকশাচালক আছেন যার রিকশায় চড়ে মৃতদের আত্মারা অন্তিম গন্তব্যে যাত্রা করে। একজন ব্যবসায়ী আছেন যিনি বিশ্বজয় করতে চান। একজন অধ্যাপক আছেন যিনি বেঁচে থাকার মূল উদ্দেশ্য জানেন। এ গল্পে আছে খুন আর রহস্য আর মৃত্যু।
প্রথমেই যা মনে রাখা দরকার তা হলো ঢাকা কোনো শহর নয়। ঢাকা হচ্ছে ভাঁটি। ভাঁটির সঙ্গে ঢাকার বাহ্যিক মিল আছে এবং উদ্দেশ্যগত মিল আছে। ঢাকা ভাঁটির মতো তপ্ত আর ঢাকা থেকে ভাঁটির মতো ক্রমাগত ধোঁয়া নির্গত হয়। এগুলো বাহ্যিক মিল। ভাঁটিতে যা প্রবেশ করে তা আগের থেকে কঠিন রূপ ধারণ করে। ঢাকার ক্ষেত্রেও তাই হয়। এটা উদ্দেশ্যগত মিল।
এখানে এক মানুষের আচরণে কঠিন হয় অন্য মানুষের দৃষ্টি আর চোয়াল। কাউকে কিছু করতে বললে তা বলতে হয় কঠিন স্বরে। কারণ কণ্ঠে সঠিক কাঠিন্য আনতে পারাটা দক্ষতার লক্ষণ। এখানে যারা গুরুত্বপূর্ণ মানুষ তাদের সারাক্ষণ অধৈর্য্য থাকতে হয় এবং বকাবকি করতে হয়। যারা গুরুত্বপূর্ণ নয় তারাও তাই করে। কারণ এমন করলে অন্যেরা তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে পারে। এখানে গাড়ি চালাতে চাইলে ঝগড়া জানতে হয় এবং দোকান চালাতে চাইলেও ঝগড়া জানতে হয়। কেউ উপদেশ দিলে ধরে নিতে হয় শালা কিছু না জেনে বুলি কপচাচ্ছে। কাউকে উপদেশ দেওয়ার সময় ভাবতে হয় বোকাচোদা এই সহজ কথাও তোরে বুঝায়ে দেওয়া লাগে?
আপনার জন্য ঢাকার কোনো সময় নেই। আপনি চলে গেলে ঢাকার অন্য বাসিন্দারা আরেকটু সহজে দম ফেলার সুযোগ পাবে। কনুইদুটো আরেকটু ছড়িয়ে বসতে পারবে।
এমন জায়গায় বছরের পর বছর কাটিয়ে মন নরম রাখতে চাইলে একটু নির্বোধ হতে হয়। এমন শহরকে ভালোবাসতে চাইলে হৃদয়ে অযৌক্তিক আর অসহ্য মমতা থাকতে হয়।
দুর্ভাগ্যবশতঃ হরু হালদারের এই দুটো দোষই আছে।
হরু এমন একজন যে খুব সহজেই একটা সরু পাহাড়ী নালা হতে পারতো। কিছু ছোটো হরিণ আর কুচো মাছ বাদে কেউ ওকে চিনতো না। সারাদিন নিজের ঝিরঝির সুরে নিজেই মুগ্ধ হতো। গাছের ফাঁক দিয়ে গলে পড়া রোদ চুরি করে খুশি থাকতে পারতো।
জন্মের আগে এসব জানা না থাকায় হরু মানুষ হয়ে জন্মেছে। তাই তার দেহ আছে। দেহে চোখ আছে যে চোখে প্রায়ই রাস্তার ধূলো ঢুকে যায়। চোখের পাতা ফেলার সময় কচকচ শব্দ হয়। হরুর দেহে পেটও আছে এবং সেই পেটের অনেককিছু বলার আছে। পেট হরুকে সময়ে-অসময়ে অত্যাচার করে। পেটের অত্যাচার দীর্ঘমেয়াদী হয় বা স্বল্পমেয়াদী হয়। পেটের স্বল্পমেয়াদী অত্যাচার হরুকে এক বসায় ষোলটা ডালপুরী আর দুই বাটি কুমড়ার ঝোল খেতে বাধ্য করে। পেটের দীর্ঘমেয়াদী অত্যাচার হরুকে রিকশা চালাতে বাধ্য করে। রিকশা চালানো হরুর প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের প্রথম এবং শেষ পেশা।
তবে হরুর রিকশায় যারা ওঠে তারা শুধু মানুষ নয়।
এটা হরুর জন্য একটা সমস্যা। পৃথিবীর সব সমস্যা দুটো কারণে তৈরি হয়। ক্ষমতার কারণে অথবা ক্ষমতার অভাবে। এটা ক্ষমতার কারণে হয়েছে।
হরুর ক্ষমতার উৎস হচ্ছে কল্পনাশক্তি। শৈশব থেকে হরুর কল্পনাশক্তি প্রবল। ঢাকার কবল থেকে মনকে বাঁচাতে তা প্রয়োজনীয় ছিল। যেসব মানুষ নিজের পরিস্থিতি মেনে নিতে পারে না কল্পনাশক্তি প্রখর হয়।
হরু এখনো দিনের অধিকাংশ সময় কল্পনায় কাটায়। হরুর কল্পনার একটা বিশেষ ধরন আছে। উদাহরণ দিলে তা পরিষ্কার হবে।
কয়েকদিন আগে বনানী মাঠের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। প্যাডেল মারতে মারতে হঠাৎ এক মরা গাছের দিকে চোখ পড়ে। একটা স্পষ্ট মুহূর্ত ওর মানসপটে ধরা দেয়। মুহূর্তে যা দেখেছিল তা হচ্ছে:
গাছের নত শুকনো ডাল।
ডানা গুটিয়ে বসেছে কাক
শরতের সন্ধ্যায়।
হরু জানে না ঠিক এই তিন বাক্য পূর্বে আরেকজন মানুষের কল্পনায় ধরা দিয়েছিল। তার জন্ম হয় বাংলাদেশ থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে এবং হরুর জন্মের পাঁচশ’ বছর আগে। তিনি কবি মাতসুয়ো বাশো। জাপানের ফুকাগাওয়া নদীর তীরে এক ছোট্ট কুটিরে বসে এই হোকু লিখেছিলেন। তার দেশের সাথে হরুর দেশের একটা বড়ো পার্থক্য আছে। বাশোর দেশেও কবি ছিল এবং রিকশাচালক ছিল। তবে সেখানে রিকশাচালকের তুলনায় কবির সংখ্যা কম ছিল।
বাশো এবং হরুর কল্পনার ধরন এক। তারা সময়ের এক-একটা মুহূর্তকে দূর থেকে ঠান্ডা মাথায় খতিয়ে দেখে। কল্পনাশক্তি তাদের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাকে ছুরির মতো ধারালো করেছে। এই ছুরি ব্যবহার করে তারা সময়ের ওপর অস্ত্রোপচার করে। অস্ত্রোপচার থেকে যা জন্মায় তার নাম কবিতা।
পর্যবেক্ষণের অসাধারণ ক্ষমতার কারণে হরু বাস্তবতাকে এমন চোখে দেখতে পায় যেমনটা সবাই পায় না। এ কারণে হরু ভূত দেখতে পায়।
এমন ঘটনা প্রথম ঘটতে শুরু করে কয়েক বছর আগে।
তখন ঢাকার তিন প্রজাতির গ্রীষ্মের মধ্যে প্রথমটা চলছে। রাত নয়টার দিকে হরু কড়াইল আর চেয়ারম্যান বাড়ির মধ্যবর্তী গলির মুখে রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ঝিরঝির বৃষ্টি। যাত্রী নেওয়ার ইচ্ছা ছিল না কারণ ততোক্ষণে দিনের জমা উঠে গিয়েছে। বৃষ্টি বাঁচিয়ে বিড়ি ধরানোর জন্য হরু মুখ ঝোঁকায়।
রিকশার সিটে কেউ উঠে বসে আর হরুকে মাথা ফেরাতে মানা করে। বলে সে ভাড়া দিতে পারবে না কারণ কয়েকদিন আগে তার মৃত্যু হয়েছে। হরু যেন মাথা না ফেরায়। দেখলে ভয় পেতে পারে।
যাত্রীর গলা শুনে বোঝা যায় সে একজন নারী। কণ্ঠ অস্বাভাবিক লাগে। থেমে থেমে এবং কষ্ট করে উচ্চারণ করছে। যেন কেউ তার গলা টিপে ধরেছে এবং শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় তার কথা বলতে হচ্ছে। নারীকণ্ঠ একটা ঠিকানা বলে। সেখানে নিয়ে যেতে হবে।
হরু বিনাবাক্যব্যয়ে কণ্ঠের প্রতি নির্দেশ পালন করে। কল্পনাপ্রবণ হবার একটা সমস্যা হচ্ছে ওর জগতে অসম্ভব বলে কিছু নেই। ভূতের উপস্থিতি নিয়ে হরু সন্দেহ করে না।
বনানীর তেরোর ই নম্বর রাস্তায় এসে মেয়েটা এক বাড়ির সামনে রিকশা থামাতে বলে। হরু কাঠের মতো শক্ত হয়ে সোজা তাকিয়ে রয়। তারপর মেয়ে একটা প্রশ্ন করে যেটা শুনে হরুর প্রচ- ভয় লাগে।
সে বলে: আমাকে এতোদিন কেউ দেখতে পায়নি। আমার কথা কেউ শুনতে পায়নি। আপনি কীভাবে পাচ্ছেন? আপনি কি আমাকে খুন করেছেন?
হরু অসম্মতি জানাতে দ্রুত দুইদিকে মাথা নাড়ে। তখন প্রশ্নের থেকেও ভয়ংকর একটা ব্যাপার ঘটে।
হরু দেখতে পায় ওর দুই কাঁধের ওপর কারো পায়ের পাতা ভেসে আছে।
গোড়ালীগুলো ওর মুখের দুইপাশে এবং পায়ের আঙুলগুলো উলটোদিকে। হরু আতংকে দিশেহারা হয় এবং দুই হাতে মাথা চেপে বসে পড়ে। তারপর মনে হয় মাথার ওপর থেকে একটা ছায়া সরে যাচ্ছে।
ভয়ের বিপরীত আবেগ সাহস নয় বরং কৌতূহল। কৌতূহলে জর্জরিত হরু আড়চোখে ওপরে তাকায়। একজন কিশোরীকে দেখা যায় ভাসমান। বাড়ির কাজের মেয়েদের সঙ্গে তার পোশাকের মিল আছে। কিশোরীর দুই পায়ের পাতা উলটোদিকে এবং তার ঘাড়ের হাড় নিশ্চয়ই গুঁড়ো হয়ে গেছে। কারণ মাথাটা ভাঙা ডালের মতো পিঠের দিকে ঝুলছে। কাচের মতো শূন্য দৃষ্টি হরুর ওপর নিবদ্ধ।
মেয়েটা নীরবে সামনের এক বাড়ির দোতলার বারান্দায় উঠে যায় এবং অন্ধকারে মিশে যায়। প্রেতিনী ওকে চলে যাওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছে কি না তা হরু বুঝতে পারে না। তাই দাঁড়িয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পর সেই বাড়ির ভেতর থেকে তীব্রস্বরে কান্নার শব্দ পাওয়া যায়। পুরুষের কান্না। হরু তখন রিকশায় চড়ে দ্রুত পালিয়ে আসে।
এরপর থেকে এমন ঘটনা বেশ নিয়মিত ঘটতে থাকে। নির্দিষ্ট করে বললে মাসে দুই-তিনবার এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাতের বেলা। একসময়ে হরুর মনে হয় একদিক দিয়ে ভালো। আমার কোনো ক্ষতি তো করছে না।
বারবার ঘটতে থাকায় অংক এবং অক্ষর জ্ঞানহীন হরুও দুইয়ে-দুইয়ে চার মেলাতে শিখে যায়। ওর মনে হয় নিশিযাত্রাগুলোর মধ্যে কিছু সামঞ্জ্যস্য আছে। কিছু ধারা আছে। নিশিযাত্রীরা রিকশায় ওঠার পর কোনো একটা ঠিকানায় পৌঁছে দিতে বলে। সেখানে গেলে বাড়িতে প্রবেশ করে। কিছুক্ষণ পর বাড়িতে কান্নার রোল ওঠে। তারপর সেই যাত্রীকে আর হরু কোনোদিন দেখে না।
রাতে যে বাড়িতে নিশিযাত্রী নামিয়েছে সেই বাড়িতে হরু দিনের বেলা আবার গিয়েছে কয়েকবার। যেমন একদম প্রথমবার যে মেয়েটাকে তেরোর ই-তে নিয়ে গিয়েছিল সেই বাড়িতে হরু ফেরে পরদিন। বাড়ির সামনে রাস্তায় বিশাল হুটোপুটি। ছালছাড়া কুত্তার মতো পুলিশের তিনটা পুরানো জিপ গাড়ি দাঁড়িয়ে শুধু ঘ্যাঁওঘ্যাঁও করে আর ঘ্যাঁওঘ্যাঁও করে।
বাড়ির দারোয়ানকে হরু জিজ্ঞেস করে ঘটনা কী। দারোয়ান বিরক্ত হয় এবং ওকে নিজের কাজ করতে বলে। হরু কিছু মনে করে না। কারণ দারোয়ানের চোখের ভীতি এবং তার ওপর চারজন পুলিশের হুকুমের চাপ ও লক্ষ করেছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর আরেক রিকশাওয়ালার থেকে ঘটনা জানতে পারে। এই বাড়ির দোতলার মালিককে খুনী সন্দেহে পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
আরেক রাতে একজন শীর্ণ যুবককে গুলশানের আগোরার পেছনের এক গলিতে নামিয়ে দেয় হরু। সে হামাগুড়ি দিয়ে বাড়িতে ঢোকে। যুবকের দুই হাঁটু এবং বাঁ হাতের কবজি ভাঙা। চলাফেরার ভঙ্গি দেখে হরুর গায়ে কাঁটা দেয়। মনে হয় মানুষ না মাকড়সা হাঁটছে।
পরদিন সকালে হরু ফিরে আসে এবং জানতে পারে সেই বাড়ির সবথেকে ওপরতলায় যে পরিবার থাকতো তারা একদিনের নোটিশে বাড়ি ছেড়ে দিচ্ছে। বাড়ির ছোটো ছেলে এক মাস আগে ছাদ থেকে পড়ে মারা গিয়েছিল।
এগুলো দেখে হরুর মনে হয় শুধু যারা অনেক কষ্ট পেয়ে মরেছে তারা ফিরে আসে। যেসব বাড়ির ঠিকানা বলে সেগুলো তাদের শেষ ঠিকানা ছিল। এই বাড়িগুলোতে তাদের কোনো অসমাপ্ত কাজ রয়ে গেছে। কোনো কারণে নিজেরা সে পর্যন্ত যেতে পারে না।
দ্বিতীয় মৃত্যু পর্যন্ত পৌঁছাতে তাদের হরুর সাহায্য লাগে। কেন লাগে সেই ব্যাপারে ও অনিশ্চিত। তদের কাজ শেষ হলে তাদের অলৌকিক অস্তিত্বের আর প্রয়োজন থাকে না। তাদের দ্বিতীয় মৃত্যু হয়।
হরুর নিজেকে পরোক্ষ যমদূত মনে হয়। মনে হয় ওর মতো আরো মানুষ আছে যাদের ওপর এই দায়িত্ব আছে। তবে তেমন কাউকে ও চেনে না। হরুর ধারণা ঠিক। তেমন কয়েকজন মানুষের সাথে যথাসময়ে হরুর এবং আমাদের পরিচয় হবে।
মৃতদের জগতে বড়ো নিয়মগুলোর পাশাপাশি কিছু ছোটো নিয়ম আছে। মৃত্যুর মুহূর্তে তাদের চেহারা এবং দেহ যেমন ছিল মৃত্যুর পর সেই চেহারা নিয়ে ফিরে আসে।
যারা ফিরে আসে তাদের দিকে সরাসরি তাকালে সমস্যা হয় না। তবে আচার-আচরণ খামখেয়ালী ও সময়বিশেষে বিপজ্জনক। কোন কথায় রাগ করে তা বোঝা কঠিন। হরুর মনে হয় তারা চিন্তামগ্ন বা অস্থির। শেষ অসমাপ্ত কাজ আর শেষ ঠিকানা বাদে তেমন কিছুতে মনোযোগ দিতে পারে না।
যারা ফিরে আসে তাদের সবার পায়ের পাতা উলটোদিকে। হরুর মনে হয় এর একটা কারণ আছে। তারা অতীতের টানে ফিরে আসে। গত জীবনের মায়া ছাড়তে পারে না। তাই প্রতীকী অর্থে তারা শুধু পেছনদিকে যেতে পারে। সামনে আগাতে পারে না। অতীত তাদের অস্তিত্বের জন্য এতো গুরুত্বপূর্ণ যে তাদের রূপে সেই গুরুত্ব প্রকাশ পায়।
যে দিনগুলোতে বৃষ্টি বেশি সে দিন তাদের দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই সে দিনগুলোতে হরু মানুষ যাত্রী তুলতে রাজি হয় না। বেশি ভাড়া চায়। যাত্রীরা বিরক্ত হয়ে বকাবকি করে। গালি শুনতে হরুর ভালো লাগে না।
হরু যদি কারো হাত ধরে এবং তখন আশেপাশে মৃত আত্মা থাকে তাহলে যার হাত ধরেছে সে-ও দেখতে পায়। বিশ্বস্ত কিছু মানুষকে হরু দেখিয়েছে। স্ত্রী এবং পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে। হরুর পরিচিত মানুষদের জন্য প্রেতযোনী হচ্ছে আশঙ্কাজনক কিন্তু দৈনন্দিন সত্য। সবাই জীবনের কোনো সময়ে ভূত দেখেছে। বা এমন মানুষ চেনে যারা ভূত দেখেছে। তারা ভগবানকে স্মরণ করতে বলে আর সাবধানে থাকার পরামর্শ দেয়।
হরু একসময় সিদ্ধান্ত নেয় এ বিষয়ে বেশি ঘাঁটাবে না। যেসব সমস্যা থাকার পরেও জীবন চলতে পারে সেগুলো সমাধানের প্রয়োজনীয়তা কম। আর কল্পনাপ্রবণ মানুষেরা সাধারণত ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে চলতে পছন্দ করে। তাদের সমস্ত সুখ মাথার ভেতর। বাইরের জগৎ যন্ত্রণা বাদে কিছু দেয় না। আর যন্ত্রণা বাড়িয়ে কী লাভ? কল্পনাপ্রবণ মানুষকে আপনি নিয়মকানুন দেবেন এবং তারা সুন্দর নিয়মকানুন মেনে চলবে। এভাবে জগতে মনোযোগ দিয়ে অপচয় হওয়া সময়ের পরিমাণ কমানো যায়।
হরুর রিকশায় তাই রাতের বেলা মৃত মানুষেরা উঠে বসতে থাকে আর হরু রিকশা টানতে থাকে। বনানী-গুলশান-মহাখালী এলাকার অনেকগুলো ঠিকানা ওর চিরতরে মুখস্ত হয়ে যায়। এ সবকিছু হরু মোটামুটি মেনে নিয়েছিলো।
কিন্তু এক রাতে নতুন আর ভয়াবহ এক বিপদ দেখা দিলো।
সেদিন সকাল থেকেই হরুর মনে হচ্ছিলো খারাপ কিছু হবে। এবং প্রতি ঘণ্টায় এমন কিছু ঘটলো যেটার পর মনে হলো খারাপ ব্যাপারটা ঘটে গেছে। তার পরের প্রতি ঘণ্টায় অধিকতর খারাপ কোনো ঘটনা ঘটলো।
পৌনে আটটার সময় ওয়্যারলেসের মোড়ে যাত্রী নামাতে যায়। দেখে সেখানে এঞ্জিন আর প্যাডেল রিকশা মিলে এর মধ্যেই রাস্তার দুইপাশে প্রায় তিরিশ রিকশার সারি। ও যদি এই লাইনে দাঁড়ায় তাহলে পরের যাত্রী পেতে দুপুর বারোটা বেজে যাবে।
একটু কায়দা করে হরু রিকশাটা ডাবল লাইন করে একপাশে রাখতে চায়। সামনে অপেক্ষমান আরেকজন রিকশাচালক হরুর বংশগত পরিচয় এবং অভিভাবকের চরিত্র নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে। তার গায়ে হলুদ হাতকাটা জ্যাকেট দেখে হরু বুঝতে পারে এই লোক গুলশান এক আর নিকেতন এলাকার রিকশাচালক। এদের জ্বালায় হরুর মতো সৎ বনানী-মহাখালী ভিত্তিক রিকশাচালকদের পেটে লাথি পড়ছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে হরু বিদায় নেয়।
রিকশা আবার বনানীর দিকে যখন নিচ্ছিলো তখন করাইলের ভেতর ওর পিসতুতো দাদা গগনের সঙ্গে দেখা হয়। গগন একরকম জোর করে হরুকে থামায়। যেমন নিশ্চয়তার সাথে হরু জানে ওর জন্ম হয়েছিলো করাইল বস্তিতে ঠিক একই নিশ্চয়তার সাথে জানে ওর মৃত্যু হবে করাইল বস্তিতে। হরুর পুরো পরিবারের জন্যেও কথাটা সত্যি। গগনের পাশাপাশি হরু বড়ো হয়েছে। বড়ো হওয়ার পর বুঝতে পেরেছে ওর পাশে না থাকাটাই মঙ্গলজনক।
আজও সেই উপলব্ধির সত্যতা প্রমাণ হয়। গগন বলে দ্রুত টাকা উপার্জনের মোক্ষম পদ্ধতি খুঁজে পেয়েছে। সেই পদ্ধতি বাস্তবায়নের জন্য ছোট্ট একটা চুরি করা দরকার। চুরির পরিকল্পনায় হরু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাই কাজ বাদ দিয়ে গগনদার সঙ্গে আসতে হবে এখনই।
এমনিতে হরুর কাজ ফাঁকি দিতে খারাপ লাগে না। কারণ ওর রিকশার মালিক এবং ম্যানেজার মনে করে কর্মচারীরা সারাদিন কাজ বাদে কিছু করলেই সেটা অপরাধ। তবে তাই বলে গগনদাকে সাহায্য করাটাও ভালো বুদ্ধি মনে হয় না। কারণ চুরি আসলেই অপরাধ।
গগনের পরিকল্পনা হচ্ছে বস্তির পাশের ফার্মেসি থেকে ছয় বোতল কাশির সিরাপ এবং দুই পাতা অ্যালাট্রল চুরি করবে। এগুলোকে মিশিয়ে একধরনের পানীয় তৈরি করবে যেটার নাম ঝাঁক্কি। বাংলাদেশের মাদকসমাজে ঝাঁক্কি এক ঐতিহ্যবাহী পানীয়। গগনদার ধারণা এই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা উচিৎ। সে টিকটকে দেখেছে বিগত সময়ে যা জনপ্রিয় ছিল সেসব আবার জনপ্রিয় হচ্ছে।
গগনের সাথে হরু জীবনে কোনোদিন ঝগড়া করেনি এবং আজকেও করে না। কারণ হরুর জীবনের যেকোনো সমস্যা সমাধানের প্রধান কৌশল বিবাদ এড়িয়ে যাওয়া আর চুপ করে থাকা। কোনো একদিন হরু বুঝতে পারবে বিবাদ এড়ানোর চেষ্টা জীবনের কিছুক্ষেত্রে যন্ত্রণা কমায় না। বাড়িয়ে দেয়। তবে এই উপলব্ধি আজ হয় না।
তিনজন মিলে ফার্মেসি যায় এবং যাওয়ার পথে গগন চিত্রনাট্য আর চরিত্র ব্যাখ্যা করে। গগন হবে যক্ষ্মারোগী যে ক্রমাগত দোকান কাঁপিয়ে কাশবে। হরু হবে তার নীরব সহযোগী। গগন দোকানীকে বোঝানোর চেষ্টা করবে গরীবের দুঃখ কতোটা গভীর হয়। আর বিনামূল্যে ঔষধের অনুরোধ করবে। দোকানী তার সাথে গল্প করবে এবং হরু সেই সুযোগে কাউন্টারের ওপাশে হাত বাড়িয়ে ওষুধ চুরি করবে।
পরিকল্পনা ভয়ংকরভাবে ব্যর্থ হয়। দোকানী আক্ষরিক অর্থেই গলাধাক্কা দিয়ে গগনকে ফার্মেসি থেকে বের করে দেয়। তারপর হরুর দিকে তাকিয়ে বলে তোরে তো আমি চিনি তুই লক্ষ্মীমাসীর ব্যাটা না? তোর বৌরেও আমি চিনি। তুই কাম ফালায় এডি কইরা বেড়াস আমি যদি হ্যাগো না কইসিÑ
এ কথা শোনার পর হরুর সারাদিন ভীষণ চিন্তায় কাটে। বৌ মালতির সাথে এমনিতেই সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। তারুণ্যে হরুর কাঁধ অবধি লম্বা চুল আর মুখচোরা স্বভাব বস্তির তরুণীদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল। হরু এ কথা জানতো না। কিন্তু ওর তখনো-না-হওয়া স্ত্রী মালতীলতা জানতো। হরুর সাথে বিয়ে বসার দিন মালতীলতার চোখেমুখে প্রচ্ছন্ন গর্ব ছিল। তা দেখে মালতীর বান্ধবী খুকী পরের তিন সপ্তাহ ওর সাথে কথা বলেনি।
তবে বিয়ের পরের এক বছরে মালতীর চেহারায় গর্ব সরিয়ে ফুটে ওঠে বিরক্তি। সংসার এবং সহবাসে হরুর কোনো আগ্রহ নেই। হরু কখনোই নিজের দেহে থাকে না বরং কল্পনায় ভাসে। যে কয়েকবার ওরা সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছে মালতীর মনে হয়েছে হরু কাজটা শেষ করতে পারলে বাঁচে। এসব নিয়ে হরুর সঙ্গে ওর আলোচনা হয়নি। কথা না হওয়ার কারণে মালতীর বুকে রাগটা আটকে আছে। হরুর প্রতিদিনের কাজকর্মে মালতীর ফুসফুসে একটু একটু করে বিরক্তি যোগ হয়।
অতি সকালে ডিউটি শুরু করার পরেও এই কপালপোড়া দিনে রাত সাড়ে দশটা অবধি হরুর জমা ওঠে না। উপরি লাভের প্রশ্নই আসে না। বনানী সুপারমার্কেটের পাশে বা গুলশান আগোরার গলিতে খালি রিকশা নিয়ে ঘুরতে থাকে। সন্ধ্যা থেকে তীব্র বৃষ্টির কারণে রাস্তায় গভীর জ্যাম হয়। তা অনেক মানুষ ফুটপাথে হাঁটতে থাকে এবং রিকশায় ওঠার প্রয়োজন বোধ করে না।
অবশেষে জ্যাম হালকা হয় রাত সাড়ে দশটার দিকে। জ্যামের সাথে সম্ভাব্য যাত্রীরাও রাস্তা থেকে উধাও হয়। হরু গুলশান মসজিদের পাশের শুনশান গলিতে একটা বাগানবিলাস গাছের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভাবে এই ফুলগুলো কতো সুন্দর তা গাছটা কোনোদিন বুঝতে পারবে না। কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে ফুলগুলোকে দেখা ওর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
এমন সময় হরুর জীবনের সবথেকে বিপজ্জনক অধ্যায়ের সূচনা হয়।
বিদ্যুতের চমকে আবার আকাশ শিউরে ওঠে এবং ঝুম বৃষ্টি নামে। হরু বাগানবিলাসের নিচে আশ্রয় নেয়। পাতা থেকে ঝলকে ঝলকে পানি কপালে পড়তে থাকে। হঠাৎ আকাশ থেকে একজন মানুষ তীব্রবেগে নেমে আসে এবং হরুর সামনের ভেজা রাস্তায় আছড়ে পড়ে।
হরু প্রথমে বিস্মিত হয় তারপর ভয় পায়। ছাদ থেকে ঝাঁপ দিলে রাস্তার সাথে সমান্তরাল হয়ে পড়ার কথা। মানুষটা সেভাবে পড়েনি। বৃষ্টির ফোঁটার মতো লম্বা হয়ে পড়েছে। মাথা নিচের দিকে ছিল এবং প্রথমে রাস্তায় মাথা ধাক্কা খেয়েছে। পরে বাকি শরীর নেমেছে। যেমন বেগে পড়েছে তাতে খুলি চূর্ণ হওয়ার কথা। তবে সে শুধু পড়ে রইলো।
একজন তরুণী।
হরু ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে এবং তরুণীও রাস্তায় উপুর পড়ে থাকে। ঝমঝম বৃষ্টি হয়। বৃষ্টির কারণে রাস্তায় অন্য কোনো মানুষ দেখা যায় না। হরু ভাবে যে বাড়ির সামনে আশ্রয় নিয়েছে সেই বাড়ির দারোয়ানকে খবর দেবে। নিভৃতচারী হওয়াতে দারোয়ানকে ডাকার আগে হরুর মানসিক প্রস্তুতি নিতে হয়। সেই সময়টুকু তরুণী রাস্তায় পড়ে থাকে আর বৃষ্টি হতে থাকে।
আর হরু দেখে বৃষ্টির ফোঁটা তরুণীকে আঘাত করছে না।
তাকে ভেদ করে ফোঁটাগুলো চলে যাচ্ছে। যেন তরুণীর দেহ বায়বীয়। তারপরেও তরুণীর চুল ছড়িয়ে আছে রাস্তায় আর ঢোলা কালো কামিজ ছড়িয়ে আছে এবং সবকিছু ভেজা।
এবার হরু একটু সাহস সঞ্চয় করে এক পা এগিয়ে যায় আর প্রশ্ন করে। বলে: আপনি কোথাও যাবেন? ঠিকানা জানেন?
তরুণী এক ঝটকায় জেগে ওঠে আর হরু আঁতকে পিছে সরে যায়। তারপর হরুর গায়ে কাঁটা দেয় কারণ ও দেখে তরুণী উঠে বসেছে আর ক্রমাগত দুই হাতে বাতাস খামচে ধরার চেষ্টা করছে। সেই অঙ্গভঙ্গি বড়ো ভয়ংকর আর জান্তব। যেন হাতদুটোর ওপর তরুণীর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। মাথা বারবার পেছনদিকে হেলে যায় যেন চিৎকার করতে চাইছে। কিন্তু চিৎকারের শব্দ হয় না। বরং মনে হয় তার গলা দিয়ে একরাশ পানি ঢুকে পড়ছে আর তার ঘড়ঘড় ঘড়ঘড় শব্দ হয়। তরুণী হরুর দিকে মুখ ফেরায় এবং তার চেহারা বীভৎস।
গাল এবং কপালের চামড়ায় অসংখ্য কামড়ের মতো দাগ। যেন ত্বকে অসুখ আছে। শ্যাওলার মতো নীলচে চামড়ার রঙ এবং হাতের আঙুলগুলোর ডগায় কালসিটে।
তার চোখদুটো গলে গেছে আর কোটর থেকে অশ্রুর মতো ঝরছে কালো তরল।
হরু বুঝতে পারে এটাই ওর জীবনের শেষ মুহূর্ত। দু’চোখ বন্ধ করে। আর ওর মনে প্রশ্ন জাগে: মৃত্যুর পর ও কার রিকশায় উঠবে?
কিছু হয় না।
কিছু হয় না।
কিছু হয় না। ঝমঝম বৃষ্টি পড়ে। গাছের পাতা চুইঁয়ে টুপটুপ পানি পড়ে কপালে।
হরু চোখ খোলে আর দেখতে পায় তরুণীর মুখ ওর মুখের ঠিক সামনে।
মেয়েটা হরুকে বলে: আমার আবার বেঁচে উঠতে হবে। আমি জানি আপনি আমাকে আবার বাঁচাতে পারবেন। আমাকে না বাঁচানো পর্যন্ত আমি আপনাকে ছাড়বো না।
তানজীম রহমান
Leave a Reply